নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে মহাবিপৎসংকেত কমে এলেও লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে উপকূলীয় জেলাগুলো। বিধ্বস্ত উপকূল জলোচ্ছ্বাসের অথৈ পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। গাছপালা ভেঙে ব্যাহত হয়েছে যান চলাচল। কয়েকটি এলাকায় গাছ পড়ে লাইন বিচ্ছিন্ন হয়েও সরবরাহ বন্ধ হয়েছে। ফলে ফলে সারা দেশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন আড়াই কোটি গ্রাহক। বন্ধ ছিল মোবাইল নেটওয়ার্কও। এদিকে, ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে দেশের বিভিন্ন জেলায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তাদের মধ্যে দুজন নারী ও আটজন পুরুষ। গতকাল সোমবার মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, ঘূর্ণিঝড় রেমাল দেশের উপকূল অতিক্রম করার সময় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- খুলনার লালচাঁদ মোড়ল, বরিশালের জালাল সিকদার, মো. মোকলেছ ও লোকমান হোসেন, সাতক্ষীরার শওকত মোড়ল, পটুয়াখালীর মো. শরীফ, ভোলার জাহাঙ্গীর, মাইশা ও মনেজা খাতুন এবং চট্টগ্রামের সাইফুল ইসলাম হৃদয়।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় বসতঘরের ওপরে গাছ পড়ে মৃত গহর আলী মোড়লের ছেলে লাল চাঁদ মোড়ল (৩৬) মারা গেছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মৃত নরিম মোড়লের ছেলে শওকত মোড়ল (৬৫) সাইক্লোন সেন্টারে যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে মারা যান।
বরিশালে এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু সংবাদ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বাকেরগঞ্জ উপজেলার আজমত আলী শিকদারের ছেলে জালাল শিকদার (৫৫) বাজারে যাওয়ার পথে গাছের ডাল ভেঙে মারা গেছে। বরিশালের রুপাতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লিলি পম্পের দক্ষিণ পাশে মেঘা কিচেন চাইনিজ রেস্টুরেন্টের উত্তর পাশের দেয়াল ভেঙে পার্শ্ববর্তী হোটেলে কর্মরত অবস্থায় মারা গেছেন মো. মোখলেছ (২৮)। এ ছাড়া একই স্থানে একই কারণে আমজাদ হালদারের ছেলে মোহাম্মদ লোকমান হোসেন (৫৮) মৃত্যুবরণ করেন।
এদিকে, জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ডুবে মারা গেছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আবদুর রহিমের ছেলে মো. শহীদ (২৭)। এখন পর্যন্ত ভোলায় বোরহানউদ্দিন দৌলতখান ও লালমোহনে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ভোলার বোরহানউদ্দিনে গাছ চাপায় মারা গেছেন জাহাঙ্গীর (৫০) নামের এক ব্যক্তি। দৌলতখান উপজেলায় গাছ চাপায় মারা গেছে মোহাম্মদ মনিরের কন্যাশিশু মাইশা (৪)। এ ছাড়া লালমোহনে টিনের ঘরের আড়ার নিচে পড়ে মনেজা খাতুন (৫৪) নামের এক নারী মারা গেছেন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ থানাধীন টেক্সটাইল জেড এলাকায় খলিলের বাড়ির বিপরীতে নির্মাণাধীন ভবনের দেয়াল ধসে সাইফুল ইসলাম হৃদয় (২৬) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া প্রবল ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রবর্তী অংশ ও বায়ুচাপ পার্থক্যের আধিক্যের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৮ থেকে ১২ ফুট অধিক উচ্চতার বায়ুতাড়িত জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে ১৯ জেলায় ৩৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৬ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৫ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিবুর রহমান। গতকাল সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী জানান, ঘূর্ণিঝড়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের কারণে খুলনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী জেলাসহ উপকূলীয় ১৯ জেলার ১০৭ উপজেলার ৯১৪ ইউনিয়ন ও পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সরকারের প্রস্তুতির কারণে বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এ পর্যন্ত ১০ জন প্রাণ হারিয়েছে।
দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের পাশে সরকার রয়েছে জানিয়ে মহিববুর রহমান বলেন, এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের ৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা সহযোগিতার জন্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি জেলায় জিআর ৩ কোটি ৮৫ লাখ নগদ টাকা। ৫ হাজার ৫০০ টন চাল, ৫ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার। এ ছাড়া শিশু খাদ্য কেনার জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা সহযোগিতা করা হয়েছে। এসব সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্তের মোবাইল অ্যাকাউন্টে যাবে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমূহে ৯ হাজার ৪২৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বা স্থায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আট লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বলে জানান ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে মঙ্গলবার (আজ) পর্যন্ত সারা দেশেই বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া থাকবে।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়টি গত রবিবার রাত ৮টার দিকে বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত করে। এরপর উপকূল থেকে শুরু করে সারা দেশে বৃষ্টি শুরু হয়। গতকাল সোমবারও তাণ্ডব অব্যাহত ছিল। বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৯০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরে ১০ নম্বর মহাবিপৎসংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়েছে।
গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে রেমালের দুর্বল হয়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়ে বলেন, রেমাল এখন স্থল গভীর নিম্নচাপ হিসেবে যশোর ও এর কাছাকাছি এলাকায় আছে। এটি আরো উত্তর-পূর্ব দিকে এগিয়ে যাবে। বিস্তারিত জানিয়েছেন আমাদের প্রতিনিধিরা।
কক্সবাজারে বজ্রবৃষ্টি ও দমকা হাওয়া, বিধ্বস্ত সমুদ্রসৈকত : কক্সবাজার থেকে সাইফুর রহিম শাহীন জানান, চরম বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে কক্সবাজারে। গতকাল সকাল ১০টার পর থেকে জেলায় বজ্রবৃষ্টি এবং দমকা হাওয়া বয়ে যায়। উত্তাল ছিল সাগর। বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ে সমুদ্রসৈকত ও উপকূলে। পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সৈকত এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছে। তবে এ পর্যন্ত জেলায় ঘূর্ণিঝড়ে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। কোথাও কোথাও গাছপালা ভেঙে পড়েছে। সমুদ্র উপকূলে পাঁচ থেকে ছয় ফুট উচ্চতায় জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সদরের কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, মহেশখালী উপজেলার সিকদারপাড়া, মাতারবাড়ী, ধলঘাটসহ জেলার অন্তত ২০ গ্রামে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়েছে।
বাগেরহাট থেকে তাহসিনুল বাকী ফাহিম জানান, রেমালের প্রভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে জেলার ৪৫ হাজার ঘরবাড়ি। উপড়ে পড়েছে কয়েক হাজার গাছপালা। খুঁটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পুরো জেলা। এ ছাড়া প্রায় শতাধিক গ্রাম ৬ থেকে ৮ ফুট জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছে। জেলার মোংলা, রামপাল, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও বাগেরহাট সদর উপজেলায় সাড়ে ৩ হাজার চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। এতে ৭৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৫৮১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় প্রায় দুই কিলোমিটার ভেড়িবাঁধ ভেঙে ৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো. খালিদ হোসেন বলেন, ৩৫৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় লক্ষাধিক মানুষ ও কয়েক হাজার গবাদিপশু আশ্রয় নিয়েছে। তাদের জন্য শুকনো খাবার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মোংলা (বাগেরহাট) থেকে আলী আজীম জানান, ঝড়ে প্রায় ৮ হাজার কাঁচা ও আধাপাকা ঘরবাড়ি, ব্যাপক গাছপালা বিধ্বস্ত হয়েছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি পড়ে গেছে। এতে রবিবার সকাল থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল পুরো এলাকা। ১০-১২ গ্রাম প্লাবিত হয়ে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ। আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার নারী-পুরুষ ও শিশু। বন্ধ ছিল মোংলা বন্দরের কার্যক্রম। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকার প্রায় ২ হাজার চিংড়ি ঘের প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস।
বোরহানউদ্দিন (ভোলা) থেকে জে এম এমিন জানান, গাছের ডাল ভেঙে পড়ে বুকের পাজরে ঢুকে গতকাল সকালে জাহাঙ্গীর পঞ্চায়েত (৪৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার সাচড়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের মৃত অলিউল্লাহ পঞ্চায়েতের ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও নিহতের ভাতিজা মো. হাসান জানান, রেমালের কারণে বাতাস ও বৃষ্টি হচ্ছিল। এ সময় চাম্বুল গাছের নিচ দিয়ে বাড়ি যাওয়ার পথে ডাল ভেঙে জাহাঙ্গীরের ডান পাঁজরের মধ্য ঢুকে যায়। উদ্ধার করে পরিবারের সদস্যরা তাকে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বোরহানউদ্দিন থানা ওসি মো. শাহীন ফকির জানান, গাছের ডাল ভেঙে পড়ে এ ঘটনা ঘটে। তাই কোনো অভিযোগ না থাকায় লাশ স্বজনরা নিয়ে যান।
খুলনা ব্যুরো জানায়, কয়রা ও দাকোপ উপজেলার ৪টি জায়গার বাঁধ ভেঙে অন্তত ২১টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ভেসে গেছে শতাধিক চিংড়ির ঘের, ভেঙে গেছে কয়েকশ কাঁচা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। এ ছাড়া রাতজুড়ে ভারী বৃষ্টি ও ঝড়ের তাণ্ডবে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আছের আলী জানান, মাটিয়াভাঙ্গা এলাকায় রাতের জোয়ারে বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। এতে ৫-৭টি গ্রামে নদীর পানি ঢুকেছে। পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী লিয়াকত আলী জানিয়েছেন, টানা বৃষ্টি ও নদীতে স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানি বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটি স্থানে বাঁধ সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেগুলো মেরামতের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া কয়রা ও দাকোপে বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।
পাইকগাছা (খুলনা) থেকে ফসিয়ার রহমান জানান, বিভিন্ন এলাকায় ওয়াপদার বাঁধ ভেঙে ও জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। যাতে চিংড়ি ঘের ফসিল জমি, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির দেওয়া তথ্য মতে, ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় এসব ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৮৩১টি ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৩ হাজার ৪১০ বাড়ি ঘর। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ২২০ মানুষ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মাহেরা নাজনীন এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ইমরুল কায়েস বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া লোকসহ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে উপস্থিত হয়ে সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি।
কয়রা (খুলনা) থেকে মজিবার রহমান জানান, বাঁধ জলোচ্ছ্বাসে উপজেলার ৩ জায়গার বাঁধ ভেঙে অন্তত ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে ভেসে গেছে প্রায় ৫ শতাধিক চিংড়ির ঘের, ভেঙে গেছে কয়েকশ কাঁচা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। ৭ ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এতে ২ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া সুতিবাজার, ৪নং কয়রা ক্লোজার, ৬নং কয়রা, কাটকাটা, গাববুনিয়া, খাশিটানা, গোলখালী, ২নং কয়রা গেটের গোড়া, লোকা, হরিণখোলা, চোরামুখা, মঠবাড়ী, তেঁতুলতলারচরসহ আরো অনেক এলাকার পাউবোর বেড়িবাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে।
মহারাজপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ জানান, দশহালিয়া এলাকায় প্রায় ৫০ মিটার বাঁধ ভেঙে কপোতাক্ষ নদের পানি ঢুকে পড়েছে। এতে অন্তত দুটি গ্রাম ও কয়েকশ চিংড়ির ঘের তলিয়ে গেছে।
মহেশ্বরীপুরের ইউপি চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ শিকারি বলেন, ইউনিয়নের সিংহেরকোণা এলাকায় বাঁধ ভেঙে গেছে। এ ছাড়া নয়ানি এলাকার বাঁধের নিচু জায়গা ছাপিয়ে সারা রাত পানি ঢুকেছে। এতে অন্তত ৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া অসংখ্য চিংড়ির ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ঝড়ের তাণ্ডব ও ভারী বৃষ্টিতে কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে শতাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আছের আলী জানান, তার ইউনিয়নের মাটিয়াভাঙ্গা এলাকায় রাতের জোয়ারে বাঁধের কিছু অংশ ভেঙে গেছে। এতে ২-৩টি গ্রামে নদীর পানি ঢুকেছে। তবে সেখানকার বাঁধ আটকানো সম্ভব হয়েছে।
শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) থেকে জি এম মনিরুজ্জামান জানান, উপকূলের ৫৪১টি কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে আংশিক নষ্ট হয়েছে ৪৪৮টি এবং সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ৯৩টি ঘরবাড়ি। এ ছাড়া প্রায় ২০০ হেক্টর মৎস্য ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গতকাল শ্যামনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা শাহিনুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, উপকূলীয় এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কে কাজ করছে না। এজন্য সবার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির একটা তালিকা করা হয়েছে। তবে তা পূর্ণাঙ্গ নয়। এদিকে, উপজেলা সামাজিক বন বিভাগ জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় রেমালে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার গাছগাছালি উপড়ে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে, সাতক্ষীরা জেলাব্যাপী এখনো ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সঙ্গে দমকা হাওয়া বইছে। জেলার ২২ লাখ মানুষ প্রায় ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন আছেন।
সিলেট থেকে তুহিন আহমদ জানান, গতকাল ভোর থেকেই থেমে থেমে দমকা বাতাসের সঙ্গে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হয়। সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্র জানিয়েছে, সিলেটে সকাল ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। বৃষ্টিতে স্বস্তি মিললেও ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবীরা ও স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরা। ভোর থেকে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কাজে বের হয়েছেন অনেকে।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জুয়েল রানা লিটন জানান, ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে নোয়াখালীর সুবর্ণচর ও দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু হাতিয়া উপজেলায় প্রায় ৫২ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উপজেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে হাতিয়ার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর চিঠিতে প্রায় চার হাজার কাঁচাঘর বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন। ওই চিঠিতে জোয়ারে প্লাবিত এলাকাগুলোয় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে বলে উল্লেখ হয়। তবে ঝড়ে গতকাল সোমবার দুপুর পর্যন্ত কোথাও কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
জেলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (পর্যবেক্ষক) রফিকুল ইসলাম বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে নোয়াখালী জেলাজুড়ে আজ (সোমবার) ভোর থেকে থেমে থেমে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বাতাসের গতি নির্ধারণের ব্যবস্থা না থাকায় সুনির্দিষ্টভাবে বাতাসের গতি নির্ধারণ করা হয়নি।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুভাশিষ চাকমা বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের আঘাতে হাতিয়ায় ৫২ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হলো নিঝুম দ্বীপ। সেখানকার বেশির ভাগ কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে পুরো নিঝুম দ্বীপ ৪-৫ ফুট পানিতে ডুবে গেছে। এ ছাড়া ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুখচর, নলচিরা, চরকিং, তমরুদ্দি ও চর ঈশ্বর ইউনিয়নও। ইউএনও জানান, ঝড়ের পরবর্তী সময়ে ঝোড়ো হওয়া ও বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় কোনো এলাকা থেকে সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল আমিন সরকার বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ঝোড়ো বাতাসে সুবর্ণচরের বিভিন্ন স্থানে গাছপালা উপড়ে পড়ে সড়ক যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। তিনি ফায়ার সার্ভিসের লোকজনকে পাঠিয়ে গাছ কেটে চলাচল স্বাভাবিক করছেন। এ ছাড়া ঝড়ে বিভিন্ন স্থানে কাঁচা ঘরবাড়ির ক্ষতি হতে পারে। তবে ঝড়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় এবং গতকাল রাত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় কোথায় যোগাযোগ করতে পারছেন না। সে কারণে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত কোনো তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে না।
Leave a Reply